জন্য অতিপ্রয়োজনীয়। কেননা, জিংক মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হজম,
পরিপাক ক্রিয়া বৃদ্ধি করে, ডায়াবেটিস, রাতকানা ও ক্যান্সার প্রতিরোধ করে,
স্নায়ুচাপ কমায়, নারী ও পুরূষের প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এছাড়াও
প্রদাহজনিত সমস্যা, একজিমা, হাড় ক্ষয়, সর্দি, চুল পড়ারোধে গূরূত্বপূর্ণ
ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশে
খাদ্যোপাদান জিঙ্কের ভূমিকা অপরিসীম। কারণ, এর অভাবে শিশুদের স্বাভাবিক
বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ দারুনভাবে ব্যাহত হয়। বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি যেমন:
ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ব্রিটিশ
মেডিক্যাল জার্নাল সম্ভাবনাময় এবং চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছে, প্রতিদিন
খাবারের সাথে জিঙ্ক সম্পূরক খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর
দরিদ্র শিশুদের নিউমোনিয়ার হার শতকরা প্রায় ২৫
ভাগ কমিয়ে আনা যেতে পারে।
সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোর দরিদ্র শিশুরাই নিউমোনিয়াসহ শ্বাসনালীর বিভিন্ন
প্রদাহে আক্রান্ত হয়ে থাকে। ‘জিঙ্ক’ এর অভাবে শিশুর ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত
হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে যায় এবং এর ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও
কমে যায়। এ ধরনের শিশুরাই পরবর্তীতে নিউমোনিয়া ও শ্বাসনালীর প্রদাহজনিত
রোগে আক্রান্ত হয়। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জিঙ্ক সমৃদ্ধ ধান উদ্ভাবনের
প্রচেষ্টা চলছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সর্বপ্রথম দেশ হিসেবে এ ধরনের ধান
অবমূক্ত করেছে।
জিংকের ঘাটতিজনিত লক্ষণসমূহ:
* দৈহিক বৃদ্ধি কমে যাওয়া
* নিম্ন রক্ত চাপ
* হাড়ের বৃদ্ধি কমে যাওয়া
* স্বাদ, রূচি কমে যাওয়া
* হতাশা
* রুক্ষ, ফ্যাকাশে ত্বক
* ওজন কমে যাওয়া
* ডায়রিয়া
* চূল পড়া
* হাতের নখের নীচে সাদা দাগ
জিংক নারী ও পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ডিএনএ পূনর্গঠন ও
কার্যকারীতায় গূরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় এনজাইম
ক্রিয়া, কোষের দ্রূত বৃদ্ধি ও প্রধান উপাদানসমূহ গঠন করে। আমাদের দেশের
শতকরা ৪০ ভাগের বেশী মানুষ বিশেষ করে শিশু ও নারীদের জিঙ্কের ঘাটতি রয়েছে।
আর্থ-সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে আমাদের দেশের বহু দরিদ্র মানুষ দৈনন্দিন
পুষ্টির জন্য একমাত্র ভাতের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ভাতে অন্যান্য খনিজ
উপাদানের মত জিঙ্কের পরিমাণও কম। প্রচলিত উচ্চ ফলনশীল জাতগুলোতে জিঙ্কের গড়
পরিমাণ ১৫-১৬ মিলিগ্রাম। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভাতে জিঙ্কের পরিমাণ যদি
এর গড় মাত্রা থেকে মাত্র ৮ মিলিগ্রাম বাড়িয়ে ২৪ মিলিগ্রাম করা যায়, তবে
আমাদের মত দেশ গুলোর দরিদ্র মানুষের দৈনিক জিঙ্ক চাহিদার কমপক্ষে শতকরা ৪০
ভাগ পূরণ করা সম্ভব।
এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা
২০০২ সাল থেকে নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে জিঙ্ক সমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন
করেছেন। এক্ষেত্রে ব্রি ধান ৬২ প্রথম সাফল্য, এতে প্রতি কেজি চালে জিঙ্ক
রয়েছে ১৯ মিলিগ্রাম। এটি আমন মৌসুমের উপযোগী আগাম জাত। মাত্র ১০০ দিনে এ
জাতটি হেক্টর প্রতি ৩.৫-৪.০ টন ফলন দিতে সক্ষম। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে
৪.৫ টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে। যেসব এলাকায় কৃষক আমন ধান কেটে একই জমিতে
আগাম আলু বা শীতকালীন সব্জি আবাদ করে অধিক লাভবান হতে চান সেসব এলাকার জন্য
এ জাতটি বিশেষ উপযোগী। আমাদের দেশের স্থানীয় জাত জিরাকাটারী ধানের সাথে
ব্রি ধান ৩৯ এর সংকরায়ন করে সনাতনী প্রজনন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ জাতটি
উদ্ভাবন করা হয়েছে বিধায় এর নিরাপদ খাদ্যমান নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
উপরন্তু, এটি স্বপরাগী জাত বিধায় ফসল উৎপাদনে কৃষক নিজেদের বীজ নিজেরা
ব্যবহার করতে পারবে, অন্য কারো উপর নির্ভর করতে হবে না। আগামী আমন মৌসুমেই এ
বীজ কৃষকের নিকট পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। আশা করা যায় আগামী বোরো মৌসুমের
পূর্বেই জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক জিঙ্ক সমৃদ্ধ বোরো ধানের জাত অবমুক্ত হবে।
জিঙ্কের অভাব জনিত অপুষ্টি লাঘবে বর্তমানে দেশে প্রচলিত অন্যান্য
কার্যক্রমের পাশাপাশি সহযোগী কার্যক্রম হিসেবে বাংলাদেশ ধান গবেষণা
ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত জিঙ্ক সমৃদ্ধ ব্রিধান ৬২ ধানের ব্যবহার একটি
কার্যকর এবং টেকসই পন্থা হিসেবে কাজ করবে।