বাংলাদেশে প্রাপ্ত বেশিরভাগ ফল গাছই দেশের সর্বত্র কম-বেশি জন্মে থাকে।
এর কারণ দেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানের আবহাওয়ায় তারতম্য খুব বেশি
নয়। দেশের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকার মাটির গুণাবলীর কিছুটা পার্থক্য আছে,
সেই সঙ্গে আবহাওয়ার কিছুটা তারতম্য থাকায় যে স্থানে কোনো একটি ফল অল্প
পরিশ্রমে সার্থকতার সঙ্গে এবং অধিকতর লাভজনকভাবে উত্পাদন করা যায়, সেই
স্থানেই মানুষ বাণিজ্যিকভাবে ওই ফল চাষ করতে শুরু করেছে। আবহাওয়ার বিভিন্ন
উপাদান এবং মাটির গুণাবলী ফল গাছের ফল ধারণ, বৃদ্ধি এবং সংরক্ষণ- ইত্যাদি
বিষয়গুলোকে কীভাবে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে নিম্নে সংক্ষেপে আলোচিত হলো-
ক. তাপমাত্রা : একেক ধরনের ফল গাছের বৃদ্ধি এবং ফল
ধারণের জন্য একেক ধরনের তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। নির্ধারিত পরিধির চেয়ে
তাপমাত্রা কম-বেশি হলে ফল চাষে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। একই ফলের বিভিন্ন জাতের
মধ্যেও তাপমাত্রার প্রয়োজন ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হতে পারে।
খ. বৃষ্টিপাত : সব ধরনের ফল গাছেরই বৃষ্টিপাতের চাহিদা
সমান নয়। বৃষ্টিপাত কম কিংবা অধিক বৃষ্টি অনেক ফল গাছের ক্ষতি সাধন করে।
গাছে ফুল ফোটার সময় অধিক বৃষ্টি হলে পরাগ রেণু ও গর্ভমুণ্ডের আঠালো রস
ধুয়ে যায়। ফুলে কীট-পতঙ্গের বিচরণ কমে যায়, এর ফলে নিষেকক্রিয়া ব্যাহত
হয়ে ফল উত্পাদন হ্রাস পায়।
বাংলাদেশে ফল উত্পাদনের ক্ষেত্রে আবহাওয়ার উপাদানগুলোর মধ্যে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত এ দুটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে ঋতুভেদে কিছুটা তারতম্য পরিলক্ষিত হয়।
বাংলাদেশে ফল উত্পাদনের ক্ষেত্রে আবহাওয়ার উপাদানগুলোর মধ্যে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত এ দুটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে ঋতুভেদে কিছুটা তারতম্য পরিলক্ষিত হয়।
গ. আলো : ফল গাছের বৃদ্ধি, ফল উত্পাদন এবং ফলের
গুণগতমান অক্ষুণ্ন রাখতে আলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ধরনের ফল গাছের
জন্য আলোর চাহিদায় ভিন্নতা রয়েছে।
ঘ. বাতাসের আর্দ্রতা : ফলের আকার, আকৃতি, রং, গুণগতমান
ইত্যাদি বাতাসের আর্দ্রতার উপর অনেকাংশে নির্ভর করে। অনেক ফল শুষ্ক
আবহাওয়ায় ভালো জন্মে, আবার কিছু কিছু ফল উত্পাদনের জন্য আর্দ্র আবহাওয়া
প্রয়োজন হয়।
ঙ. বাতাসের গতিবেগ : বাতাসের গতিবেগ ফল চাষের জন্য
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাতাসের গতিবেগ বৃদ্ধি পেলে গাছ এবং মাটির রস
দ্রুত নিঃশেষ হয়, এজন্য ঘন ঘন পানি সেচের প্রয়োজন হয়। এর ফলে উত্পাদন
খরচ বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া ঝড়ো বাতাসে ফল গাছের এবং ফলের অধিক ক্ষতি সাধিত
হয়।
চ. মাটির গুণাবলী : সাধারণত, উঁচু জমি ফল চাষের জন্য
অধিক উপযোগী। দেশের সব স্থানের জমির গুণাবলীতেও বেশ পার্থক্য পরিলক্ষিত
হয়। কোনো স্থানের মাটি লালচে, কোথাও কালচে, কোনো স্থানের মাটিতে বালির
আধিক্য, আবার কোথাওবা কর্দমাক্ত। কোনো স্থানের মাটিতে লবণের ভাগ বেশি,
কোথাও আবার অম্লমান অধিক। কোথাও কম নিষ্কাশিত, কোথাওবা সু-নিষ্কাশিত। পানির
স্তর কোথাও কম, কোথাও বেশি। মাটির উর্বরতা এবং ফল উত্পাদনের জন্য
প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদানের তারতম্য রয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের
মাটিতে।
ফল গাছের পারিপার্শ্বিক উপযোগিতা বিচার করে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন
অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ, অর্থনীতি, ফলশিল্প এবং
সামাজিক বিষয়াদির উপর ভিত্তি করে প্রধান প্রধান ফলের চাষ বিশেষ বিশেষ
এলাকায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে। নিম্নে বাণিজ্যিক উত্পাদনকারী জেলাসমূহের একটি
তালিকা দেয়া হলো-
১. কলা-মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, বগুড়া, রংপুর, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা,
কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, রাঙামাটি, বান্দরবান ও ময়মনসিংহ।
২. পেঁপে-রাজশাহী, পাবনা, নাটোর, যশোর, খুলনা, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি।
৩. আম-চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, পাবনা, গাজীপুর, রাঙামাটি ও রংপুর।
৪. লিচু-পাবনা, দিনাজপুর, রাজশাহী, গাজীপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, নাটোর, কুষ্টিয়া, যশোর, ময়মনসিংহ ও পঞ্চগড়।
৫. কাঁঠাল-চট্টগ্রাম, ঢাকা, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, নরসিংদী, রাঙ্গামাটি,
দিনাজপুর, নাটোর, পঞ্চগড়, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নরসিংদী ও কুষ্টিয়া।
৬. আনারস-সিলেট, টাঙ্গাইল, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও নরসিংদী।
৭. তরমুজ-চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ঠাকুরগাঁও, নাটোর, কুষ্টিয়া, যশোর, কুমিল্লা, পটুয়াখালী ও রাজবাড়ী।
৮. আমড়া-বরিশাল, ঝালকাঠি, মাদারীপুর, পিরোজপুর ও যশোর।
৯. পেয়ারা-বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, যশোর, পাবনা, গাজীপুর, কুমিল্লা, রংপুর, নাটোর, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি।
১০. নারিকেল-পটুয়াখালী, খুলনা, বাগেরহাট, ভোলা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রংপুর ও নাটোর।
১১. লেবু জাতীয় ফল-সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, রাঙামাটি, রংপুর, পঞ্চগড় ও খাগড়াছড়ি।
১২. কুল-পাবনা, রাজশাহী, রংপুর, গাজীপুর, কুমিল্লা, বরিশাল ও সিলেট।